একজন শিক্ষার্থীর ভালো রেজাল্ট এর জন্য শুধু হোম টিউটর এবং ভালো স্কুলই কি যথেষ্ট?

নড়াইলের মধ্যবিত্ত এক পরিবারের ছেলে কৌশিক। ছোটবেলা থেকে ক্রিকেটই তার ধ্যান-জ্ঞান। দেশের আট-দশটা পরিবারে যখন পরিবারগুলো প্রায় পুরোপুরিই ক্রীড়াবিমুখ, ঠিক সে সময় কৌশিকের পরিবার ছিল ভিন্ন স্রোতে, তার খেলার জন্য পারিবারিক সহায়তা আর সমর্থন ছিল ভিন্নমাত্রায়। এই কৌশিক-কে আজ সবাই চেনে। বলা হচ্ছে বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম সফল খেলোয়াড় মাশরাফি বিন মর্তুজার কথা। মাশরাফিকে যখন তার সফলতার পেছনের কারণ জিজ্ঞাসা করা হয়, তার সাবলীল জবাব থাকে নিজের ইচ্ছাশক্তি আর পরিবারের সমর্থন, তারপর আসে কোচ, সহকর্মী আর ভক্তদের কথা। হোম টিউটর, আর স্কুলের মাধ্যমেই ভালো ফলাফল সম্ভব কিনা এ নিয়ে বলতে গিয়ে মাশরাফি আর ক্রিকেট কেন? এমন প্রশ্ন মাথায় চলে আসতেই পারে।

এখানে একটি ভালো স্কুলকে একটি ক্রিকেট কোচিং ক্লাব আর একজন হোম টিউটর-কে একজন কোচের সঙ্গে তুলনা করা চলে। ভাল ক্লাব আর ভালো কোচের তত্ত্বাবধানে খেলেও কোনো খেলোয়াড় কেমন খেলবেন তা পুরোপুরি নির্ভর করে খেলোয়াড়ের নিজের ইচ্ছাশক্তি আর পরিশ্রমের উপর। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাটাই এমন যে অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই ইচ্ছাশক্তিটা শিক্ষার্থীদের থাকে না। পরিবার থেকেই যেহেতু শিক্ষার হাতেখড়ি তাই শিক্ষার্থীর এ ইচ্ছাশক্তি আর মনোবল গড়ে তোলার দায় অনেকাংশে বর্তায় পরিবারের উপরেই।

বলা হয়ে থাকে, শিশুর জন্য সর্বোত্তম শিক্ষক হচ্ছেন তার মা-বাবা। এ পর্যায়ে তারা যেভাবে গড়ে তুলবেন শিশু সেভাবেই শিখে বড় হবে, যার পরোক্ষ প্রভাবটা শিক্ষার্থীর পরবর্তী পর্যায়েও রয়ে যায়। এখানে স্কুল শুধু প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তাদানকারী আর গৃহশিক্ষক অনেকটা সমন্বয়কারী ও দিকনির্দেশনা দাতা হিসেবেই কাজ করেন। তাই স্কুল বা টিউটরের সঙ্গে কাটানো দিনের কয়েক ঘণ্টা সময় একজন শিক্ষার্থীর ভালো রেজাল্টের একমাত্র নিয়ামক হতে পারে না। বরং পুরো দিনের অধিকাংশ সময় পরিবারের সঙ্গে থাকায় মূল তদারকির ভার পরিবারের সদস্যদেরই। তাই শিক্ষার্থী তার স্কুলের পড়া নিয়মিত পড়ছে কিনা অথবা হোম টিউটরের দেখিয়ে যাওয়া অনুশীলনের কতোটা নিতে পারছে এসবের খবরাখবর রাখা উচিত অভিভাবকেরই।

কেবল সফলতায় আনন্দের ভাগিদার হয়ে নয় বরং ব্যর্থতার সময়ও পরিবারের সবার সাহস আর উৎসাহ শিক্ষার্থীর শক্তি হয়ে উঠতে পারে। তাই পরীক্ষার রেজাল্ট আশানুরূপ না হলে একতরফা স্কুল বা হোম টিউটরের উপর দোষ না চাপিয়ে সন্তানদের লেখাপড়ায় কোথায় ঘাটতি রয়েছে সেদিকে লক্ষ্য করতে হবে। শুধু হোম টিউটর আসলেই বাসায় পড়া হবে- এমন অভ্যাস থাকে অনেকেরই, কিন্তু যদি শিক্ষার্থী প্রতিদিন নিজের মতো করে পড়তে বসার অভ্যাস না করে তাহলে তা ভালো ফলাফলের অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। বাবা-মা, ভাই- বোন আর বড়দের সহযোগিতায় সে নিজেই যাতে পড়ায় আগ্রহী হয়ে উঠে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে।

একজন শিশু বেড়ে উঠে পরিবারে। পরিবারের সব সদস্যদের সঙ্গে তার বোঝাশোনা গড়ে উঠে ছোটবেলা থেকেই। তাই হোম টিউটর বা স্কুলের চেয়ে পরিবারের সদস্যরা তার দুর্বলতা সহজেই ধরতে পারেন। এজন্য তার অভ্যাস, আচরণ এমনকি পড়াশোনার একনিষ্ঠ ইচ্ছা আর দায়িত্ববোধ জাগ্রত করায় পরিবারের বিকল্প নেই।

একজন শিক্ষার্থীর পরীক্ষার রেজাল্টকে তার পড়াশোনার দক্ষতা যাচাইয়ের মানদণ্ড ধরে নেওয়া হয়। তাই প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে যতই বিতর্ক থাকুক, পরীক্ষায় ভাল ফলাফলের বিষয়টিকে পাশ কাটানোর উপায় নেই। আর ভাল রেজাল্টের জন্য নিয়ম মেনে পড়া আর অন্য কাজে সময় নষ্ট করছে কিনা তা লক্ষ্য রাখার পাশাপাশি শিক্ষার্থীর সুস্থতা নিশ্চিত করাও জরুরি। যেমন একজন শিক্ষার্থী সকালে না খেয়ে স্কুলে গেল, সারাদিন ক্লাসের পর বাসায় ফিরল, এভাবে দিনশেষে পড়তে বসে কতটুকুই বা পড়তে ইচ্ছা করবে। আবার কেউ যদি সারারাত না ঘুমিয়ে স্মার্টফোনেই বেশি ব্যস্ত থাকে তাহলে পরদিন পড়া স্বাভাবিকভাবেই ঠিকঠাক হওয়ার কথা নয়। এ দিকগুলো নিয়ে পরিবারকেই সচেতন হতে হবে, তার শারীরিক আর মানসিক সুস্থতার দিক যাচাই করার উপায় হোম টিউটর বা স্কুলের নেই।

সব শেষে, ভালো ফলাফলে হোম টিউটর আর স্কুলের প্রয়োজনীয়তাটা একেবারেই উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে না, তবে তারা শুধুই নিয়ামক হিসেবে কাজ করতে পারে। কিন্তু মূল সহায়তা আসতে হবে পরিবার থেকেই। পরিবার, স্কুল,হোম টিউটর আর শিক্ষার্থীর নিজ ইচ্ছাশক্তির সমন্বয়টা ঠিকঠাক হলে ভালো ফলাফল নিজেই এসে ধরা দেবে।

Leave a reply:

Your email address will not be published.

Site Footer