টিউটরকে সময় বেঁধে দিয়ে লাভ কতটুকু?

“আপনাকে কিন্তু দুই ঘন্টা পড়াতে হবে” – প্রথম দিন অভিভাবকের কাছ থেকে এমন বাক্য শুনেননি এমন টিউটর হয়ত কমই পাওয়া যাবে। নিছক বাধ্য হয়েই হয়ত অভিভাবকের বেঁধে দেওয়া ‘ঘণ্টা’-র ঘানি টেনে গেছেন এমন টিউটর পাওয়াও কঠিন নয়। ঘড়ি ধরে পড়ানোর ভুক্তভোগী কি কেবল টিউটর? আর এভাবে সময় ধরে পড়ানোতে একজন শিক্ষার্থীরই বা কতটুকু লাভ হচ্ছে- তা ভেবে দেখেছেন কি?

ধরা যাক, পড়ানোর দায়িত্ব নেওয়ার সময় একজন শিক্ষককে ঘড়ি বেঁধে একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত পড়াতে বলা হল। এর ফলাফল কী হতে পারে?

টিউটর পড়ালেন, কিন্তু নির্ধারিত সময়ের আগেই পড়ানো শেষ হল। বেঁধে দেওয়া সময় পূরণে অতিরিক্ত সময়টুকু হয়ত বসেই কাটালেন তিনি। পুরোটা সময় শিক্ষার্থী আর টিউটর অবচেতন মনেই ঘড়ির দিকে নজর রাখায় পড়ার চেয়ে সময় নষ্ট-ই বেশি হয়। অথচ এই সময়টুকু শিক্ষার্থী অন্য কাজে দিলে তা তুলনামূলকভাবে তার জন্যই হয়ত বেশি ভালো হতো। অন্যদিকে সময়ের চেয়ে পড়ানোর বিষয়ে বেশি জোর দিলে টিউটরও দায়িত্ব নিয়ে নিজের মত পড়াতে পারতেন। সময় বাড়াতে যেয়ে তাই অনেক ক্ষেত্রেই পড়ানো আর পড়ার মান কমে যায় অনেকখানি, সময় ঠিকই দেওয়া হয় কিন্তু যে উদ্দেশ্যে সময় দেওয়া তা হয়তো রয়ে যায় অধরা-ই। বিষয়টা অনেকটা বাজার থেকে সস্তায় নিম্নমানের দ্রব্য অনেক বেশি পরিমাণে কেনার মতো হয়ে দাঁড়ায়।

টিউটরদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়াদের সংখ্যাই বেশি। নিজেদের পড়ার পাশাপাশি তারা পড়িয়ে থাকেন। তাছাড়া অনেক সময় টিউটরের জরুরি কাজ থাকতেই পারে। সেক্ষেত্রে তার তাড়া থাকাটাও অস্বাভাবিক নয়। এরকম অবস্থায় বাঁধা-ধরা সময় মেনে পড়ানো একজন টিউটরের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। পড়ানোটা তখন তার জন্য আনন্দের বদলে বিরক্তিতে পরিণত হয়, যার প্রভাব পড়ে পড়ানোতেও।

একজন টিউটরের জন্য পড়ানোটা কাজ নয়, দায়িত্ব। তিনি যখন শিক্ষার্থীকে পড়ানোর দায়িত্বটুকু নিচ্ছেন, তখন পড়ানোর ব্যাপারে তার নিজের কিছু পরিকল্পনা থাকে। সময়ের দিকটা নিজের মতো বুঝে নিয়ে পরিকল্পনা মতো পড়ানোই টিউটরের দায়িত্ব। টিউটরও শিক্ষার্থীকে বুঝে নিয়ে তার মতো করেই পড়াবেন। যেমন পরীক্ষার আগে প্রস্তুতির জন্য বেশি সময় দরকার হলে টিউটর নিজ দায়িত্বে যেমন বাড়তি সময়টুকু দেবেন, তেমনি কোনো কোনো দিন পড়ার সময় কম হওয়াও অস্বাভাবিক নয়। এক্ষেত্রে অভিভাবকের পক্ষ থেকে বেঁধে দেওয়া ‘দুই ঘণ্টা’ বা ‘তিন ঘণ্টা’ সময় নিয়ে বচসা অনেক সময়ই টিউটরের জন্য টাকার মাপকাঠি হয়ে দাঁড়ায়। ফলে পড়ানোর ‘দায়িত্ব’ অনেক সময় ‘বাণিজ্যিক খাতে’ পরিণত হয়।

বেঁধে দেওয়া সময় মেনে পড়তে যেয়ে মূল ভোগান্তির শিকার হয় শিক্ষার্থী। একটানা অনেক সময় ধরে পড়া একঘেয়েমিতে পরিণত হয়। আবার হয়তো,  রুটিন মাফিক টিউটর আসলেন, শিক্ষার্থী পড়তেও বসল, অথচ সেই সময় সে হয়তো শারীরিক বা মানসিক স্থিতাবস্থায় নেই। ঘড়ি ধরে নির্ধারিত সময় বসে থাকা তার জন্য ফলপ্রসূ হয় না। বরং পড়ার  উৎসাহ নষ্ট হয়ে পড়ার অনীহা সৃষ্টি হয়। এভাবে শিক্ষার্থীর চোখে টিউটর সহায়ক হিসেবে নন, বরং মূর্তমান বিভীষিকাতে পরিণত হয়।

টিউটর ‘সময় ধরা’ সহায়ক নন, শিক্ষার্থীর শিক্ষা সহায়ক। তাই সময় নির্ধারণ না করে অভিভাবকরা কোন ক্ষেত্রে টিউটর জোর দিতে পারেন সেই পরামর্শ দিতে পারেন। তাহলে কি ‘টিউটর কম সময় দিয়ে যা-তা পড়িয়ে যাবে?’ – এমন প্রশ্ন উঁকি দিতেই পারে। সেক্ষেত্রে অভিভাবকরা পড়ানোর অগ্রগতি নিয়ে নিয়মিত খোঁজ রাখতে পারেন। চাইলে কিছু মাইলফলকও নির্ধারণ করে দিতে পারেন টিউটরের জন্য। বেঁধে দেওয়া সময় মানা হচ্ছে কিনা সেদিকে নজরদারির চেয়ে এসব মাইলফলকে ধাপে ধাপে পড়ার অগ্রগতি কতটুকু হচ্ছে তা লক্ষ্য করা উচিত। চাপিয়ে দেওয়া নয়, বরং শিক্ষার্থী-কে বুঝে সেভাবে পড়ানোর জন্য টিউটর যাতে নিজের পরিকল্পনা মতো এগুতে পারেন সেদিকে জোর দিলে টিউটর- শিক্ষার্থী উভয়ের জন্যই ভালো হবে।

সব শেষে বলা যায়, পড়াশোনার ব্যাপারটিকে  অনীহা বা বাণিজ্যিক বিষয়ে পরিণত করা যাবে না। শিক্ষার্থীর পড়া বুঝতে সহায়তা করার জন্যই টিউটরের প্রয়োজনীয়তার শুরু। তাই সময়ের গণ্ডিতে না বেঁধে বরং মান দিয়ে যাচাই করুন। স্বতঃস্ফূর্তভাবে শিক্ষার্থী এভাবে যা শিখবে তা ‘বেঁধে দেওয়া সময়ের’ মাপে সম্ভব নয়।

Leave a reply:

Your email address will not be published.

Site Footer